সুরের মূর্ছনা
সুরের মূর্ছনা
পৃথিবী! যৌবন পেরিয়ে প্রায় অশীতিপর,
শশী গেছে ফেটে, মহা প্রলয় নিকটতর।
জীবনটা ধরায় বিতৃষ্ণ, আঁধারময়,
তবুও অনাদি আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
হেদায়েতের সুশীতল ছায়ায় আশ্রিত হতে হয়।
অসীম সে জীবনের প্রত্যয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
তাইতো মোরা জড়ো হয়েছিলাম নববী জ্ঞানের মহীরুহে,
নিয়তির সব দুঃসহ লিখন নিয়েছিলাম সহে।
আমরা এসেছিলাম এ জামেয়ার প্রাঙ্গণে,
মিলেমিশে একাকার হয়েছিলাম তার অঙ্গনে।
সূচনার গায়ে মলিনতার ছায়া এখনো পড়েনি,
থেমে গেলো পথচলা, খতম হলো কালসরণি।
উঠলো বেজে করুণ স্বরে বিদায়ের অশনিসংকেত,
“ছড়িয়ে পড়ো পথে প্রান্তরে” আর থেকো না সমবেত।
হে সত্যের আলোকবর্তিকা আসাতেযা-এ কেরাম!
আপনাদের পদতলে মোদের অজস্র সালাম।
যাঁরা জাতির চেতনার শিকড়ে
তাওহীদি চেতনার জল ঢেলেছেন জীবন ভরে,
আপনারা তো তাঁদেরই উত্তরসূরি,
চলার পথের যোগ্য অনুসারী।
ধরণীর বুকে গগনের নিচে যারা আজি আছে,
আপনারাই শ্রেষ্ঠ মানব মহান খোদার কাছে।
জ্ঞানকাননের অতন্দ্র প্রহরী হে কাণ্ডারীরা!
এসেছিলাম মোরা সবাই এ জামেয়ার ক্যাম্পাসে,
যাতে করে ভেসে না যাই কালো স্রোতের অবভাসে।
ঠাঁই নিয়েছিলাম পিতৃত্বের কোমল ছায়াতলে,
অজ্ঞতার নিকষ আঁধারে ছিলাম মোরা নিমজ্জিত,
অতঃপর আলোর সন্ধানে হয়েছিলাম নিয়োজিত।
ওহে হেদায়েতের সুমহান দিকপাল!
আপনারাই তো জ্বালিয়েছেন আলোর মশাল।
জীবনের আনন্দ-সুখ সব জলাঞ্জলি দিয়ে
আপনাদের ব্যস্ততা ছিল শুধু আমাদের নিয়ে।
জীবনের স্রোত ভুলে আমাদের করেছেন গঠন,
স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসায় করেছেন যতন।
জ্ঞান্তৃষ্ণা নিবারণ করে ব্যয় করেছেন সারাটি জীবন,
পরিবর্তে করেছি মোরা শুধু অবমূল্যায়ন।
অমার্জিত আচরণে দিয়েছি আঘাত বারবার,
হারিয়ে গেছে ভাষা আজ ক্ষমা প্রার্থনার।
শুধু বলব সন্তানকে কি ক্ষমা করা যায় না?
করেছিল সে যতসব অপব্যবহার আর অবমাননা।
বিরহের করুণ সন্ধিক্ষণে আমরা নিচ্ছি আজ বিদায়,
আপনাদের দোয়াই মোদের চির সম্বল-সহায়।
জামেয়ার ওহে পুষ্পকলিরা!
এই তো কদিন হলো আমরা ছিলাম তোমাদের মতো,
দাপিয়ে দাপিয়ে চলেছি যে এখানে কতশত।
সুখাবহ দিনগুলো এখনো যায়নি মিটে,
আনন্দের দিবারাতি এখনো যায়নি টুটে,
ঘনিয়ে এলো হঠাৎ করে বিদায়ের পালা!
ভেঙে গেলো সহসাই এ বন্ধনের তালা।
আসা-যাওয়া আর আশা-নিরাশা ধরার চিরন্তন রীতি,
তবুও হৃদয় মুষড়ে পড়ে, চায় না ভুলতে কভু স্মৃতি।
স্নেহের অনুজেরা!
তোমাদের মাঝে আমাদের পদচারণা হেতুতে
আরোহিত হয়েছিলাম পরস্পর এক হৃদিক সেতুতে।
ছিল না তাতে কোনো ভনিতার ছায়া,
নির্ভেজাল ছিল মোদের ভালোবাসার কায়া।
তোমাদের কাছে পেয়েছি কত যে সুব্যবহার,
মুগ্ধ মোরা যা পেয়েছি, তা ছিল না পাওয়ার।
অনেক কিছুই ছিল তোমাদের চাওয়া ও পাওয়ার,
অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত করেছি বারবার।
বেদনাক্লিষ্ট এ মুহূর্তে আমাদের আশা,
সবকিছু যাবে ভুলে রেখে ভালোবাসা।
হে বিদ্যারণ্য!
আমরা এসেছিলাম তোমাতে,
তোমার প্রস্রবণে জ্ঞানপিপাসা মিটাতে।
তুমি দিয়েছিলে আমাদের তাপানুকূল ঠাঁই,
রন্ধ্রে রন্ধ্রে তোমার ভালোবাসা ছড়াতে চাই।
গড়ে দিয়েছো জীবন মোদের মাতৃ ভালোবাসায়,
বিনিময়ে কী দিতে পেরেছি তোমায়!
আমাদের তরেই তো ছিল তব সব আয়োজন,
যে হৃদে এতদিন করেছি অবগাহন।
বাস্তবতার চোখরাঙানিতে আজ হয়েছে বোধোদয়,
অবহেলার পরিণাম কত ভয়াবহ হয়!
কত যুক্তিহীন ছিল সেই উপলব্ধিজাত বিভ্রম,
কী দেবো বিনিময়ে! আমরা যে অক্ষম!
পরিতৃপ্ত হয়ে আজ তোমার দেওয়া জলে,
ব্যথার পাহাড় সুহৃদে, আমরা যাচ্ছি চলে।
প্রভুর দ্বারে দুহাত তুলি, বেঁচে থাকো তুমি,
কালের চাকা ঘুরে যাবে, যাবে ফেটে ভূমি।
তোমার আলো হয় যেন আরও বিকশিত,
আঁধার সমাজ তব আলোয় হয় যেন আলোকিত।
প্রাণপ্রিয় রেল্লা এলাকাবাসী!
জামেয়া শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশী
আপনাদের মেহনতের ফল এ প্রতিষ্ঠান,
আপনাদের শ্রমেই উঠেছে গড়ে এ শিক্ষাঙ্গন।
আপনাদের পাথেয় রসদে জামেয়া পরিপুষ্ট,
ত্যাগ স্বীকারের এটাই তো উপমা প্রকৃষ্ট।
হে হিতাকাঙ্ক্ষী রেল্লাবাসী!
জামেয়ার হিতৈষী পড়শি,
আপনারাই তো আমাদের আত্মার আত্মীয়।
আপনাদের স্নেহ-ভালোবাসা ছিল অভাবনীয়।
কায়িক শ্রমে আর অমায়িক প্রেমে খোদার,
করেছেন যারা প্রতিযোগিতা সহযোগিতার।
অতঃপর তুলেছেন ঢেকুর
এক অনাবিল স্বর্গীয় তৃপ্তির।
হয়েছে ফলে নয়নাভিরাম এ বাগান,
ইলমে নববীর উৎকৃষ্ট প্রাণ।
হে খোদা! যেদিন পালাবে ভাই ভাই থেকে,
আপনজন ভুলবে যেদিন আপনজনকে।
আমাদের সাথে সেদিন তাদের হয় যেন মিলন,
জান্নাতুল ফেরদাউস যেন হয় অনন্ত জীবন।
২০১১ সালে জামেয়া তাওক্কুলিয়া রেঙ্গার ডায়েরি জন্য লিখা।
কোন মন্তব্য নেই